এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির বিষয়টিকে কি বর্তমান সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কি না। বাণিজ্য উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান তার চিরাচরিত ‘ড়’-সমৃদ্ধ বাচনভঙ্গিতে জানিয়েছেন যে সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের সাথে সংলাপে যেতে প্রস্তুত, এ ব্যপারে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে যে ডেডলকের শিকার হয়ে আছে, তা থেকে শান্তিপূর্ণ ভাবে বেরুনোর জন্য সরকারের সদিচ্ছা অবশ্যই জরুরি। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুজন জীবিত ব্যাক্তির একজন। এ সত্য প্রমাণিত ও সকল তর্ক-বিতর্কের উর্দ্ধে। তাকে মুক্তি দেয়া বর্তমান রাজনীতিক সংকটের অবসানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এতে কোন সন্দেহ নেই। আর এতেও কোন সন্দেহ নেই যে দুজন জনপ্রিয় ব্যাক্তির একজনকে আটক রেখে আরেকজনকে মুক্তি দিলে সমস্যার কোন অর্থপূর্ণ সমাধানে পৌছানো সম্ভব নয়।
সরকার এখন পর্যন্ত মোট কটি দলের সাথে সংলাপে বসেছে তা আমি শুরুতে গুনতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরে দেখলাম এতগুলো পার্টির নাম মনে রেখে গোনাটা বেশ কষ্টকর কাজ। এই পার্টিগুলোর প্রায় সবই সরকারের সাথে সংলাপে বসেছেন, চায়ে ভিজিয়ে সল্টেড বিস্কিট আর স্যান্ডউইচও খেয়েছেন। এবং বি. চৌধুরি, হাসানুল হক ইনু বা কামাল হোসেনের পক্ষ থেকে কিছু অলীক-রুপকথা পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রস্তাব ছাড়া এই সংলাপে বলার মত কিছুই ঘটেনি। একটি ল্যাপটপ সামনে রেখে হোসেন জিল্লুর রহমান সাহেব একের পর এক দলের সাথে সংলাপ করে গেছেন। রাজনৈতিক সংলাপে ল্যাপটপের কি ব্যাবহার থাকতে পারে, তার সম্ভাব্য যুক্তি খন্ডন করতে গিয়ে দুর্জনেরা বলেন, আগে থেকে ঠিক করে রাখা কথাগুলো ঠিকঠাক নির্ভুল ভাবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যেই হোসেন জিল্লুর সাহেব সংলাপের মাঝে ল্যাপটপে অক্লান্ত গুতোগুতি করেন। নিন্দুকদের আরেকটি ছোট দল আছে যারা ল্যাপটপের আরেকটি অপ্রিয় ব্যাবহারের কথা বলছেন। দুর্জনদের বক্তব্য বিশ্লেষনে আমরা না যাই। বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশে বিদ্যমান শ’খানেক পার্টির হাজার খানেক নেতার সাথে বছরচুক্তি সংলাপ করে কাজের কাজ কিছুই হবে না, যদি বিএনপি আওয়ামী লীগ সংলাপে না আসে। এটা খুবই বাস্তব সত্য যে বিএনপি আওয়ামী লীগ সংলাপে বসলে দেশের আর কোন রাজনৈতিক দল সেখানে না থাকলেও কোন সমস্যা হতনা। কিন্তু এখানে ঘটেছে উল্টোটা। বিএনপি আওয়ামী লীগ ছাড়া আর সবাই সংলাপে গিয়েছেন। যার কারণে সংলাপের কোন প্রভাব দেশের মানুষের মধ্যে পড়েনি। তারা জানতেও চায়না কে সংলাপে গেল, না গেল। এই আজও দেখলাম আ.স.ম. আব্দুর রব সংলাপে গিয়ে জাতীয় সরকারের জন্য দরবার করেছেন। এধরণের দাবিগুলো সংলাপের গুরুত্ব জনমনে আরও কমিয়েছে। যে সংলাপে কোন পার্টি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধান পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়, সেই সংলাপের ব্যাপারে মানুষের অনীহা সৃষ্টি না হওয়ার কোন কারণ নেই। যেসকল পার্টি এখন পর্যন্ত সংলাপে অংশ নিয়েছে, দু’একটি ছাড়া কোনটিরই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোন ধরণের কোন সাফল্য নেই। দু’একজন ছাড়া একজন নেতাও এখনও জানেননা নির্বাচনে জয়লাভ বস্তুটি আসলে কি। দু’একজন যারা জানেন, তারা জীবণের শেষকালে এসে একটা পলিটিকাল ফ্যান্টাসির ঘোরে আছেন, একদা-সাফল্য হারানোর বেদনা ভুলতে না পেরে তারা আবোল-তাবোল বক্তব্য দেন, কথায় কথায় “জাতীয় সরকার! জাতীয় সরকার!” জপ তোলেন। এসব কোন দল বা কোন নেতাকেই মানুষ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কোন কার্যকর অংশ হিসেবে মনে করেনা। যার কারণে এদের অংশ নেয়া সংলাপের খবরকে দেশের সচেতন মানুষ অখ্যাত চিত্রশিল্পীর আর্ট এক্সিবিশানের খবরের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়না।
উপরোক্ত সবগুলো কথাই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সংলাপ ক্যাম্পেইনের ব্যাপারে কিছু বাস্তব সত্য। আর এগুলো যে আমি সহ দেশের শুধুমাত্র গুটিকতক মানুষই জানে, তাও নয়। সরকারের কর্তাব্যাক্তিরাও এ ব্যাপারে বেশ সচেতন। লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, সরকার শুরুতে দুই নেত্রীকে ছাড়াই দুদলকে সংলাপে আনতে চেয়েছিল। বিএনপিকে চিঠি দেয়ার ক্ষেত্রে খন্দকার দেলোয়ার আর হাফিজুদ্দিন দুজনকেই চিঠি দেয়া হয়। বিশেষ করে খন্দকার দেলোয়ারকে ‘মহাসচিব’ আখ্যা দিয়ে চিঠি দেয়া হয়। এতে হাফিজুদ্দিন কান্নাকাটি শুরু করেন এই বলে যে তাকে কেন মহাসচিব বলা হলনা। কিছুদিন আগেও যে হাফিজ বর্তমান সরকারের খুবই নেকনজরে ছিল, এবার সরকার হাফিজের অশ্রুর কোন মূল্যই দিল না। ধরে নেয়া যায় সরকার বিএনপিকে সংলাপে পেতে খন্দকার দেলোয়ারকে মূলধারার মহাসচিব হিসেবে স্বিকার করেই নিয়েছিল। এদিকে সংলাপের আমন্ত্রনের পর মতিয়া চৌধুরী ছাড়া আওয়ামীলীগের আর সব নেতাই দোনোমনো করছিলেন যে সংলাপে তাদের আদৌ যাওয়া উচিত হবে কিনা। মতিয়া চৌধুরী শুরু থেকেই বলেছেন নেত্রী ছাড়া সংলাপের প্রশ্নই আসেনা। আর খন্দকার দেলোয়ার শুরুতেই সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে চেয়ারপার্সন বেগম জিয়াকে ছাড়া কোন সংলাপ নয়। খন্দকার দেলোয়ারের এই ঘোষণার পরদিন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম থেকে ঘোষণা আসে তারা নেত্রীকে ছাড়া সংলাপে যাচ্ছেন না, তোফায়েল আহমেদ, আমু, রাজ্জাক এক প্রতীকি অনশনে এই ঘোষনা দেন, পরে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও এই ঘোষণা দেন। দুই দলের এরকম অবস্থানের পর হোসেন জিল্লুর রহমান পড়ে যান বিপদে। তিনি “আমি আশাবাদী! আমি আশাবাদী!” বলে মুখের ফেনা তুলে ফেলেন। তখন থেকে এই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি একটা ডেডলকের মধ্যে আটকা পড়ে আছে। ছোট শিশুও বোঝে দুই নেত্রীকে মুক্তি দেয়া ছাড়া এই লক থেকে বেরুবার কোন রাস্তা নেই। ছোট শিশুর চেয়ে সরকার অবশ্যই বেশি বুদ্ধি রাখে, তাই তারা হয়তো অল্টারনেটিভ খুজছিলেন। তারা খুজে পেতে কি অল্টারনেটিভ পেলেন তা জানা যাচ্ছে না, তবে আজ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তি পেলেন। তাকে মুক্তি দিতে গিয়ে আভ্যন্তরীণ ভাবে সরকারকে একটি আইনী জট খুলতে হয়েছে, যে জট তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন কিছুদিন আগে।
ধরে নেয়া যাক, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যেই মুক্তি দেয়া হয়েছে শেখ হাসিনাকে। কিন্তু, শুধুমাত্র শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে সংলাপে উপস্থিত রেখে যদি ভবিষ্যতে কেউ এই সংলাপের সাফল্য খোজেন, তবে সেই সাফল্য কোনদিনই পাওয়া যাবেনা।
দেশের পুরো রাজনৈতিক কাঠামো দেশের দুটি প্রধান দলের উপর ভিত্তি করে নির্মিত। দুটি দলের মাঝে যেকোন একটি দলকে বাদ দিলে আরেকটি দলের উপস্থিতি কোন প্রভাব ফেলতে পারেনা। দুটি দলের যেকোন একটিকে সরিয়ে রেখে দেশের ভবিষ্যত পরিকল্পনা করা চরম অদূরদর্শীতা।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে আজ মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং সরকারি মুখপাত্র হোসেন জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে সংলাপে পেতে চায়। এই পদক্ষেপ স্বাগত জানাবার মত। কিন্তু শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সাথে সংলাপ করে দেশের কোন রাজনৈতিক সমাধান পাওয়ার আশা করা চরম অদূরদর্শীতা। শেখ হাসিনার চিৎসকরা তার উন্নত চিকিৎসার জন্য আবেদন জানিয়েছেন বলে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়েছে একথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু হোসেন জিল্লুর রহমানের ঐ বক্তব্যের পর এটি অবশ্যই প্রতীয়মান যে তাকে মুক্তি দেয়ার পেছনে রাজনীতিও সম্পৃক্ত আছে। আর রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সংলাপে শেখ হাসিনা আর বেগম খালেদা জিয়া উভয়ের উপস্থিতি একান্ত জরুরি।
সরকার তার আইনী তৎপরতার মাধ্যমে যেভাবে শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে তাকে রাজনীতিতে অংশ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারেও সরকারকে তৎপর হতে হবে, আন্তরিক হতে হবে। আমরা সবাই দেখেছি তারেক রহমানকে কিভাবে আদালতে হাজির করানো হয়েছে। তিনি একটানা পাঁচ মিনিট বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননা। আমরা দেখেছি আরাফাত রহমান কিভাবে আদালতে উপস্থিত হন। এদের প্রত্যেকের মেডিকেল রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হয়েছে। পেশ করেছেন সেসব চিকিৎসকরা যাদের সরকার নিয়োগ দিয়েছে। এনারা জানিয়েছেন তারেক রহমান দুটি শারীরিক সমস্যার শিকার হয়েছেন যার একটির চিকিৎসা বাংলাদেশ বা তার আশেপাশের কোন দেশেই হয়না। তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে বিদেশ না পাঠালে তাকে আমরণ পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে। আরাফাত রহমান কোকোর ব্যাপারে ঠিক একই বক্তব্য পেশ করেছেন চিকিৎসকরা। তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হোক।








